Skip to content Skip to sidebar Skip to footer

ভূ-পর্যটক রামনাথ বিশ্বাস দু-চাকায় ঘুরেছেন সারা দুনিয়া

লিখেছেনঃ আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল,  ভূ-পর্যটক, সাইকেলে ভ্রমণ করেছেন ৫৭টি দেশ

৮৬৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। ইংল্যান্ডের বাসিন্দা জন মায়ার, রাওলে টার্নর আর চার্লান স্পেনসার—তিনজন সাইকেল চালিয়ে লন্ডনের ট্রাফালসার স্কোয়ার থেকে ৫৩ মাইল দূরে ব্রাইটোন গেলেন। সময় লাগল পনেরো ঘণ্টা। পরের মাসেও তাঁরা পাড়ি দিলেন লিভারপুল থেকে লন্ডনে, সাইকেলে সময় লাগল তিন দিন।


এসব ছোট ছোট ঘটনাই সাইকেল ভ্রমণের শুরুর কথা। ধীর ধীরে সাইকেল ছড়িয়ে পড়ল, জনপ্রিয় হতে থাকল দুই চাকায় ভ্রমণ। জনপ্রিয়তার কারণ মূলত দুটি—ভ্রমণে খরচ কম এবং রোমাঞ্চকর। সেই ধারবাহিকতায় ইংল্যান্ডের থমাস স্টিভেনাসকে বলা হয়ে থাকে সাইকেলে বিশ্বভ্রমণকারী প্রথম ব্যাক্তি। যিনি ১৮৮৪ থেকে ১৮৮৬ সাল সময়কালে বিশ্বভ্রমণ করেন। তাঁর সেই বিশ্বভ্রমণ পথ দেখিয়েছিল এই বঙ্গ দেশের তরুণদেরও।


বাঙালি ঘরকুনো বলে যে অপবাদ আছে, সেই কথাটি সর্বাংশে সত্য নয়। বরং বাঙালি অনেকক্ষেত্রে অনেকের চেয়ে সাহসী। তাই বিনে পয়সায় বা স্বল্প পুঁজিতে সাইকেলে বিশ্বভ্রমণকারী বাঙালির সংখ্যাও নেহায়াত কম নয়।


রামনাথ বিশ্বাস দুই চাকায় বিশ্ব দেখা বাঙালিদের অনুসরণীয় একজন। মনে দুর্জয় সাহস আর বাহন হিসেবে একটি সাইকেল নিয়ে তিনি পৃথিবীর এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত ঘুরছেন। সেসব অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন একের পর এক বই। তাই বাংলা ভাষায় সর্বাধিক (প্রায় ৩০টি) ভ্রমণবিষয়ক বইয়ের লেখকও তিনি। ভ্রমণ সাহিত্যের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র সৈয়দ মুজতবা আলীর চেয়ে বয়সে ১০ বছরের বড় ছিলেন রামনাথ। জন্মও একই অঞ্চলে।  


বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার বিদ্যাভূষণ পাড়ায় রামনাথ বিশ্বাসের জন্ম, ১৮৯৪ সালের ১৩ জানুয়ারি। বাবা বিরজানাথ বিশ্বাস আর মা গুণময়ী দেবীর দুই সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। রামনাথের বড় ভাই কৃপানাথ বিশ্বাস এলাকায় হৃদয়বান চিকিৎসক হিসেবে খ্যাতনাম ছিলেন। শৈশবেই মা-বাবাকে হারিয়ে এই ভাইয়ের সংসারেই বেড়ে উঠেন রামনাথ।    


স্থানীয় স্কুলেই পাঠ জীবন শুরু আট বছর বয়সে। বয়স যখন ১৩, রামনাথ তখন বানিয়াচংয়ের হরিশ্চন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। সেই সময়ই বিদ্যালয় ছেড়ে হাতেখড়ি নেন রাজনীতিতে। যোগ দেন বিপ্লবী দল অনুশীলন সমিতির অন্তর্গত সুশীল সেনের শাখায়।


অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন কর্মী হিসেবে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ল। ঠিক তার কয়েক বছর পরই শুরু হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ১৯১৪ সাল। তিনি যোগ দেন ‘বাঙালী পল্টন’-এ। ছোটখাটো চেহারা ছিল তাঁর। উচ্চতা ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি। শরীর রোগা-পাতলা। কিন্তু মনে অসীম তেজ আর দুর্জয় সাহস।


বাঙালী পল্টনে অফিসের বড়বাবু হিসেবে যোগ দিয়ে বেশি দিন কাজ করা হয়নি। অসুস্থতার কারণে বাড়ি ফিরতে হয়।  এরপর আবারও যোগ দেন সৈন্য বিভাগে। ১৯১৮ সাল থেকে চাকরির সুবাদে ঘুরে বেড়ালেন। পেলেন ভ্রমণের অনুপ্রেরণা।  


সেই অনুপ্রেরণায় একদিন তাঁকে সাইকেল সমেত পথে নামাল। তখন তিনি সিঙ্গাপুরে চাকরি করেন। এসেছিলেন ১৯২৪ সালের শেষের দিকে।

দেশে দেশে রামনাথ

১৯৩১ সালের ৭ জুলাই। সিঙ্গাপুরের কুইন স্ট্রিটের বাঙালি মসজিদের সামনে তখন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের উপচেপড়া ভিড়। যাদের অনেকের বাড়িই বৃহত্তর সিলেটে। সবার চোখে-মুখে বিস্ময়। সেই বিস্ময়ের কিছুটা ছুঁয়েছিল ৩৫ বছর বয়সী রামনথাকেও। কিন্তু সব সংশয় সব বাধা উপেক্ষা করে প্যাডেল মারলেন রামনাথ বিশ্বাস। শুভেচ্ছা জানাতে আসা জনতা  ‘বন্দে মাতরম’-এর পাশাপাশি ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনিতে কুইন স্ট্রিট মুখরিত করে তুলল। সমবেত জনতার উল্লাস দেখে পৃথিবীর পথে বেরিয়ে পড়া যুবক রামনাথের সাহাসের পারদ যেন বেড়ে গেল বহুগুণ।
তাঁর যাত্রায় সম্বল বলতে দুটো চাদর, এক জোড়া চটি, এক বাক্স সইকেল মেরামতের সরঞ্জাম আর ‘Ravnd the world, Hindu Traveller’ লেখা সাইকেলটি। এটি নিয়ে  ঘুরে বেড়াতে থাকলেন দেশের পর দেশ।  


প্রথমে সিঙ্গাপুর থেকে গেলেন মালয়েশিয়া। সেখান থেকে থাইল্যান্ড হয়ে পা রাখলেন চীনে। দীর্ঘদিন কাটল পৃথিবী পর্যটনে রামনাথের প্রিয় এই দেশে। এরপর কোরিয়া হয়ে জাপানের ‘কোবে’ বন্দরে যখন পা রাখলেন, ক্যালেন্ডারের পাতায় সে দিনটি—১৯৩২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর।


জাপান থেকে পা বাড়িয়েছিলেন আমেরিকার পথে। কিন্তু বাঁধ সাধে কানাডা সরকার।  নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে তাঁকে জাপান হয়ে ফিরে আসতে হয় চীনে। সেখান থেকে পাড়ি জমান ফিলিপাইন। ঘুরে দেখেন ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপপুঞ্জ। এরপর ফের ফিরে আসেন সিঙ্গাপুর।


মাস দুই বিশ্রাম নিয়ে নবতর উৎসাহ-উদ্দীপনায়া বেড়িয়ে পড়লেন দ্বিতীয় বার। সময় ১৯৩৩ সালের জানুয়ারি। সিঙ্গাপুর থেকে রেলগাড়িতে পিনাং। পেনাং হয়ে জাহাজে বার্মার মারগুহ বন্দর । ছয় মাস বার্মা ঘুরে উত্তর-পূর্ব ভারতের মনিপুর শিলং ঘুরে সিলেট যেতে গিয়ে ঢালু রাস্তায় আছাড় খেয়ে পা ভাঙেন। একটু সুস্থ হযে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, রাজশাহী, মুর্শিদাবাদ, কৃষ্ণনগর, কুচবিহার, শিলিগুড়ি, দার্জিলিং হয়ে কলকাতায় মাস ছয়েক বিশ্রাম। আবার ১৯৩৪ সালের জুলাইয়ে কলকাতা ছেড়ে সমগ্র উত্তর ভারত হয়ে আফগানিস্তান, পারস্য ইরাক, সিরিয়া, লেবানন হয়ে তুরস্ক। তুরস্ক থেকে ইউরোপ ঢুকে বুলগেরিয়া, যুগোশ্লাভিয়া, হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া, জার্মানি, ইংল্যান্ড, বেলজিযাম, ফ্রান্স হয়ে ইংল্যান্ড স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড হয়ে জাহাজে কলকাতা ফেরেন। এবং তখন ঘাঁটি গাড়েন ৩৭নং হ্যারিসন রোডের মেস বাড়িতে। ১৯৩৪ সালেই তিনি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার লেখা প্রকাশ করার চেষ্টা করেন। প্রথম রাধারমন চৌধুরী তার ‘প্রবর্তক’ পত্রিকায় সুযোগ করে দেন। পরে অবশ্য ‘আনন্দবাজার’ ‘অমৃত বাজার’ অ্যাডভান্সড প্রভৃতি সংবাদপত্র আর ‘দেশ, বসুমতী, সঞ্জীবনী প্রভতি বিশিষ্ট পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। ১৯৩৭ সালে যখন রামনাথ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশীর্বাদ চাইতে শান্তিনিকেতনে যান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রকাশ করেন যে, তিনিও ‘দেশ’ পত্রিকায় রামনাথের লেখা পড়তেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রামনাথ বিশ্বাসের অটোগ্রাফের খাতায় লিখেলেন,  আশীর্বাদ বার্তা।

এরপর পরে বছরই ছিল রামনাথের তৃতীয় ও শেষ বিশ্বভ্রমণ। ১৯৩৮-৪০ সাল পর্যন্ত ভ্রমণ করেন তিনি। প্রথমে কলকাতা থেকে মুম্বাই গিয়ে জাহাজে মোম্বাসো (কেনিয়া) দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। আফ্রিকার কেনিয়া, উগান্ডা, টাঙ্গানিয়াকা, জালিবার, ন্যায়াসাল্যান্ড, মেজোম্বিক রোডেশিয়া হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা; সেখান থেকে জাহাজে আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে; আবার বন্দি থাকার পর শেষে অনুমতি পেয়ে পশ্চিম থেকে পূর্ব সমগ্র দেশটি চষে ফেলে শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কালো ছায়ার মধ্যে জাহাজে দেশে ফেরেন।

তাঁর দীর্ঘ সাইকেল ভ্রমণে দেখা দেশ, মানুষ, সমাজ, সংস্কৃতির কথা অভিজ্ঞতার বয়ানে বিভিন্ন বইয়ের লিপিবদ্ধ করেন। ভ্রমণ কাহিনি, গল্প উপন্যাস মিলিয়ে রামনাথ বিশ্বাসের প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৪০টি।
শেষ জীবনটা তাঁর ভারতের কলকাতেই কেটেছে। ১৯৫৫ সালের ১৯ নভেম্বর সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিশ্বজয়ী ভূ-পর্যটক রামনাথ বিশ্বাস।

প্রথম বাঙালি ভূ-পর্যটক

পায়ের তলায় সরষে কথিত বাঙালিও সাইকেলে দেশ ভ্রমণে বের হতে শুরু করেন বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে। ভারতের বিমল মুখার্জি (১৯০৩-১৯৮৭) দুই চাকায় ভর করে বিশ্বভ্রমণে বের হন ১৯২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর। ১১ বছরের পরিক্রমায় বিশ্বের প্রায় সবকটি মহাদেশ ভ্রমণ করেন। তিনি তাঁর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন ‘দুই চাকায় দুনিয়া’ নামে একটি বই। তিনিই প্রথম বাঙালি ভূ–পর্যটক যিনি দুই চাকায় বিশ্ব দেখেছেন।

তথ্যসূত্র


১. রামনাথের পৃথিবী: শ্যামসুন্দর বসু
২. অন্ধকারের আফ্রিকা: রামনাথ বিশ্বাস
৩. ভ্রমণের নেশা: শ্রী মণীন্দ্র নাথ মুস্তোফী

Leave a Comment