Skip to content Skip to sidebar Skip to footer

কয়েকটি আলপাইন মুহূর্ত

লিখেছেনঃ শেগুফতা শারমিন

বছরে অন্তত: একবার হিমালয় দেখা চোখে এবারই প্রথম আল্পস দর্শন। হিমালয় যেন প্রাচ্যের মৌনী ঋষি। তার পরতে পরতে গাম্ভীর্য আর রহস্য। উচ্চতায় বিশালত্বে সবকিছুৃ ছাপিয়ে যাওয়ার তৃপ্তি। অন্যদিকে আল্পস তার গঠন গড়ন সবকিছুতেই বুঝিয়ে দেয় সে পাশ্চাত্যের। অত বিশাল নয় বটে তবে একবারে হাল আমলের কেতাদুরস্ত যেন। এ যাত্রায় আলপাইন সৌন্দর্য্য দেখা শুরু হয়েছে সুইজারল্যান্ড থেকে। প্যারিস থেকে জেনেভা, জেনেভা থেকে জুরিখ। এরপর জুরিখ থেকে লুগানো হয়ে ইতালিতে প্রবেশ। পুরোটা সময়ই আল্পস থেকেছে সঙ্গে অথবা আল্পসের সঙ্গেই চলেছি আমরা।


তবে একেবারে নয়ন জুড়িয়ে আল্পসের দেখা পাই মেরানে। মেরান বা মেরানো। এক জায়গার তিনরকম নাম। জার্মান ভাষায় মেরান, ইতালীয়ানে মেরানো আর সেই প্রাচীন লাতিনে মারান। জার্মান আর ইতালী ভাষার নাম দুটোই অফিসিয়ালী স্বীকৃত। মেরান আসলে একটা ছোট্ট শহর বা জেলা শহর। ইতালীর একদম উত্তরে, যেখানে দেশটির সীমানা মিলেছে অস্ট্রিয়া আর সুইজারল্যান্ডের সাথে। সেখানেই পাহাড়ের কোল ঘেঁষে নয়নাভিরাম ছোট্ট এ উপত্যকা। সড়ক পথে ইউরোপ আসলে গোলক ধাঁধাঁ। কখন যে কোন দেশ মাড়িয়ে যাই ঠাহর করা মুশকিল। সেই গোলকধাঁধাঁর মানচিত্রে মেরানের মতো শহরের কুষ্ঠি ঠিকুজি ঠিক করা সামান্য একজন টুরিস্টের জন্য অনর্থক। শুধু বলতে পারি রোম থেকে নয় ঘন্টার ট্রেন যাত্রার শেষে সকাল ৮টায় এসে নেমেছি বোলজানো। বোলজানোরও চারদিকে আল্পস। ট্রেন থেকেই টের পাচ্ছিলাম বাইরে বৃষ্টি। নেমেও দেখি রিমঝিম । বৃষ্টি¯œাত প্রত্যুষে অদ্ভুত অপার্থিব একটা শহরের সাথে পরিচয়।


বোলজানো থেকেই আমাদের যাত্রা মেরানের পথে। সঙ্গী লন্ডনের বাবলু ভাই আর বোলজানোর জাহাঙ্গীর ভাই। আজকের ঘোরাঘুরির সব পরিকল্পণা বাবলু ভাইয়ের মাথায় আর বিএমডাব্লিউ’র স্টিয়ারিং জাহাঙ্গীর ভাইয়ের হাতে। আমাদের কাজ শুধু দু’চোখ দিয়ে দেখা। একবার ডানে একবার বামে। রাস্তার একদম গা ঘেষে আঙুর ক্ষেত। মাইলের পর মাইল। শীত নিদ্রা শেষে মাত্র নতুন পাতা বেরোচ্ছে। সমতল থেকেই আস্তে আস্তে ক্ষেত গুলো উঠে গিয়েছে পাহাড়ের ঢালে। আর পাহাড় মানে আল্পসের ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। মাথায় এখন আর বরফের টুপি নেই। বরং একবারে নিপাট সবুজ জামা দিয়ে গা মোড়ানো। গায়ে গায়ে দূরে দূরে প্রতিবেশিহীন একটা দুটো বাড়ি। যত উঁচুতেই হোক সব বাড়িতেই যাওয়ার জন্য পাকা রাস্তার পাকা ব্যবস্থা। এ যুগের বানানো বাড়ির সাথে আছে বেশ কিছু ক্যাসেল। শত শত বছর আগে রাজাদের বানানো প্রাসাদ। এখন প্রায় সবই বড় বড় হোটেল।


পুরো একটা ঘন্টাও না, এরকম পথে যেতে যেতেই বরফ মোরানো আল্পসের উঁকিঝুঁকি। শীতের শেষে আল্পসের যে রঙ হয় একদম বুঝিয়ে দেয় সবুজ কত প্রকার ও কি কি। এত সবুজ এত সবুজ। আর অজ¯্র নাম না জানা ফুলের সমারোহ। আর যেখানে আপেল বাগান। সেখানে তো কথাই নেই, যতটা দেখা যায় শুধুই আপেল ব্লোসম। সাদা আর গোলাপী আপেলের ফুলে ছেয়ে গেছে দিগন্ত।


এরকম চলার পথেই হঠাৎ একটা স্থানীয় বাজার। আসলে হাট। প্রতি শুক্রবারে বসে। স্থানীয় লোকরাই বিক্রেতা এবং ক্রেতা। সবজি, ফল, পনির, জামা, জুতো থেকে শুরু করে মাছ, মাংস, ফুল আর গাছের চারা কি নেই! কোন এলাকার জীবন যাপন বোঝার জন্য স্থানীয় বাজার বরাবরই আমার কাছে প্রিয় মাধ্যম। আর এতো একবারে সাপ্তাহিক হাট। তাও আবার ইউরোপের । এ লোভতো সংবরণ করা যায়না। বাবলু ভাইও ঢাকে বাড়ি দিতে সময় নেন না। অতএব গাড়ি থামলো এবং আমরাও নামলাম। আমাদের নামিয়ে দিয়ে উনারা দু’জন চললেন আরেক কাজ সারতে। এই ফাঁকে আমরা হাঁটি, দেখি মানুষ কি কিনছে, কিভাবে কিনছে। বেশ বয়স্ক এক দম্পতি কিনলেন বেশ কিছু হৃষ্টপুষ্ট বেগুনের চারা। হয়তো তাদের শখের বাগান, নয়তো পুরোদস্তুর কৃষক। আমরা যেমন শুটকি মাছ কিনি, ওরা দেখি কিনছে শুকনো পোর্ক। মাত্র ক্ষেত থেকে তুলে আনা টাটকা সবজি। দেখি আর চোখ টাটায়। নিজের রান্নাঘরটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কোথাও বিক্রি হচ্ছে গরম গরম বিভিন্ন সাইজ আর চেহারার রুটি। দোকানের জমজমাটি অবস্থা দেখে জিভে জল আসে। ক্ষিদে নেই তারপরও কিনে নেই গরম ক্রসন্ট। সবজি, জামা কাপড় আর জুতার দোকান পার হয়েই দেখি মাছের কারবার। বড় একটা দোকানে একপাশে কাঁচা মাছ আরেক পাশে ভেজে, সালাদ বানিয়ে বিক্রির ব্যবস্থা। একদম ফ্রেশ। কড়াই থেকে তুলছে টেমপুরা করা সোনালী রঙা আস্ত চিংড়ী। আগেই বলেছি ইটালীর অংশ হলেও এখানে জার্মান ভাষী মানুষের সংখ্যা বেশি। মাছওয়ালা লম্বাটে লোকটাও জার্মান ছাড়া দ্বিতীয় ভাষা জানে ‘ইশারা’। সুতরাং সেই কবে ইউনিভার্সিটির সেকেন্ড ইয়ারে শেখা অদ্ভুত উচ্চারণের ডয়েশ আর ইশারা দিয়ে যা বলি আর যেভাবে দামাদামি করি তাতে মনে হয় ঠকিনি এক পেনিও। মাত্র দু’ ইউরোর কয়েন দিয়ে পাই গুনে গুনে ১০টা প্রমাণ সাইজ চিংড়ি। ডিসপজেবল বাটি থেকে তুলে খাবার জন্য ছোট দুটো কাঠি। তখন ইলশে গুড়ি বৃষ্টিটা চলছিলোই। এর ভেতর গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ওই চিংড়ির স্বাদ, খাদ্য রসিক মাত্রই তা অনুমান করতে পারবেন। তবে চিংড়িতেই শেষ না। ওখানে যে দেখেছি একেবারে টাটকা স্কুইডের সালাদ। এটা কি আর মিস করা যায়। সুতরাং আবার দোকানের সামনে যাওয়া। য্যায়ার গুট, য্যায়ার গুট বলে মাছওয়ালা রাঁধুনিকে ধন্য করে তোলা। এবং মাত্র এক ইউরো খরচ করে আবারো প্রায় একবাটি সিফুড সালাদ নিয়ে নিজের বার্গেইন করার নব্য প্রতিভা আবিস্কার করে নিজেই মুগ্ধ।


বাজার দেখা শেষ হলো, পেটপুজোও হলো দুর্দান্ত। এবার বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচাতে হবে মাথা। বাজারটার উল্টা দিকেই ট্রেন স্টেশন। এটা মেরানের মূল স্টেশন।


অনেক অনেক বছর আগে ব্রিটিশরা ভারত উপমহাদেশের অংশ হিসেবে আমাদের দেশে যেরকম স্টেশন করেছিল। স্বাধীন হতে হতে, প্রতি ৫ বছরের ইজারাদার পার্টির পকেট ভরতে ভরতে যেসব আমরা ধ্বংস করেছি নির্দয়ভাবে। প্রায় সেরকমই ছোট একটা স্টেশন। লাল ইটের ঘর। মাথার উপর টালির টোপর। কুমিরের এলিয়ে দেয়া পিঠের মতো প্লাটফরম। কিন্তু যতেœর ছোঁয়া সর্বত্র। পরিস্কার, ঝকঝকে তকতকে। আমাদের অনেক পয়সা বানানো লোকের বাড়ির বসার ঘরের চেয়েও পরিস্কার। একটা বড় ঘরে বিক্রি হচ্ছে চা কফি বিয়ার। প্লাটফরমে পেতে রাখা গোল গোল ছোট টেবিল আর চেয়ারে বসে চলছে তার সদ্ব্যবহার। বেশির ভাগ মানুষই বয়স্ক। নারী পুরুষ সবাই। একধরণের অলস সময় কাটাচ্ছে। স্টেশনের প্লাটফরমে। নিভৃতে নির্জনে।


আমরাও দু’কাপ কফি নেই। একটা ওষুধের গ্লাস সাইজ কাপে তিতকুটে এসপ্রেসো আরেকটা প্রমান সাইজ মগে সাদা ফেনা ওঠা কাপুচিনো। রেললাইনের দিকে মুখ করে বসি। রেল লাইনের ওপারেই একটা ছোট পাহাড়। কপালের উপর ঝুলে আছে খন্ড খন্ড মেঘ। প্লাটফরমের চালে উঠে যাওয়া জুঁই টাইপের একটা ফুল ঝাড়। মিষ্টি একটা ঘ্রাণ এসে নাকে লাগে। এরকম সুন্দর একটা মুহূর্ত এক জীবনে কতবার ফিরে আসে?


সময় থেমে থাকেনা, থেমে থাকেনি মেরানের স্টেশনেও। ঠিকই সময়মতো বাবলু ভাই আর জাহাঙ্গীর ভাই এসে হাজির। এবার ওঠার পালা। গাড়িতেই পেরিয়ে যাই মূল শহর। ছোট্ট নিপাট পরিপাটি একটা শহর। সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বাস। বেশির ভাগ বিল্ডিঙেই হোটেল। মূল শহরটা পার হয়েই গাড়ি পার্ক করা যায় এমন একটা জায়গা দেখে নেমে পড়ি। নামার পর থেকেই একটা কেমন যেন আওয়াজ। সুরেলা, একটানা মৃদু অথচ দৃঢ় ঝংকার। কিছুটা হাঁটতেই চক্ষু কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন। এ এক আস্ত নদী। কিন্তু চরিত্রে যেন ঝর্ণা। আল্পসেরই কোন একটি চূড়া থেকে জন্ম হয়েছে । এর পর গড়িয়ে চলছে এখানে ওখানে। নদীটির নামও অদ্ভুত সুন্দর একটা ডয়েশ শব্দ। আদিজে। উচ্চারণ করতে গেলেই লম্বাটে টান আসে। নদীর রঙ সবুজ, একবারে পান্না সবুজ। যেখানে আছড়ে পড়ছে পাথরে সেখানে যেন অজ¯্র হীরা ভেঙ্গে ভেঙ্গে ¯্রােতে মিশে যাচ্ছে। আদিজে নদী শেষ হয়েছে মেরানে এসেই। পাশার নামে আরেকটি নদীর সাথে মিশে। তারপর যা নিয়ম, ছোট ছোট শাখা নদী উপনদী একসময় মিলেছে রাইনে। আমাদের দেশে যেমন প্রায় সব নদী পদ্মা, মেঘনা বা যমুনায় গিয়ে মিশে। ইউরোপের এ অঞ্চলের ছোট নদীগুলোর আসল গন্তব্য রাইন হয়ে নর্থ সি। দক্ষিণে নয়, উত্তরে চলে নিরন্তর এ যাত্রা।


আদিজে নদীর যে জায়গাটাতে আমরা এসেছি, তার এক পাশে বিশাল বাগান। একেবারে পরিকল্পিত বড় গাছ, ছোট গাছ, নানা রঙের ঘাসফুল তৃণের আল্পনা। এখানেও বেশিরভাগই টুরিস্ট এবং বয়সে প্রবীণ। মে মাসের প্রথম সপÍাহ, সামার ভ্যাকেশন শুরু হয়নি তখনো। তাইতো তরুণরা নয়, অবসরে থাকা প্রবীণরাই জমিয়ে তুলেছেন চারপাশ। মেরানের অন্যতম টুরিস্ট আকর্ষণ এখানকার স্পা রিসোর্টগুলো। প্রায় সারা বছরই জমজমাট।
সেদিন আমরা নদীর ধারে ছিলাম প্রায় ঘন্টা দুয়েক। মনে হয় যেন সারা জীবন থাকি। পাহাড়ের ঢালে ছোট্ট একটা বাসা, দূরে মেঘে ছাওয়া তুষার ঢাকা পাহাড় চূড়া, আদিজের গান, ঝকঝকে নীল আকাশ, প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বিশুদ্ধ বাতাস। জীবনে আর কি চাই! হয়তো এভাবেই ভাবতেন ফ্রান্সৎ কাফকা, তাই ঘুরে ফিরে প্রায় আসতেন মেরানে। কিন্তু এখনকার বিশ্বায়ন, কর্পোরেটের যুগে আমাদের কাছে তা আকাশ কুসুম।


ভর দুপুরে আমরা মেরান ছেড়ে বের হই। এবার গন্তব্য আবার বোলজানো। এ শহরটিরও দুটো নাম। ইতালীয়ানে বোলজানো আর জার্মানে বোজেন। দুটোই চলে পাশাপাশি। সব সাইনবোর্ডই দু’ভাষায়।


সেদিন আমরা লাঞ্চ সারি হসপিটালে। উহু ভুল পড়েননি। হসপিটালের কথাই বলেছি। বোলজানোর সরকারী হাসপাতাল, তারই পরিপাটি ক্যান্টিন। জাহাঙ্গীর ভাইয়ের ছেলে হয়েছে কয়েকদিন আগে। মাতা পুত্র তখনো হাসপাতালে। সেখানেই কিছুটা সময়ের জন্য যাওয়া। হাসপাতাল নয়তো যেন অন্যকিছু। যার যেমন প্রয়োজন তেমন ভাবে সাজানো। পাহাড়ের উপর কারো বাড়ি, হয়তো হঠাৎ অসুস্থ্য হলেন বা লেবার পেইন্ নো চিন্তা হাসপাতালের নিজস্ব হেলিকপ্টার গিয়ে নিয়ে আসবে। সব মিলিয়ে ২০ থেকে ২৫ মিনিটের ব্যাপার। আর এক বার হাসাপাতালের ভেতর ঢুকতে পারা মানে নো চিন্তা। এখানে যেন আজরাইলের প্রবেশ নিষেধ। রোগী মানে রোগী, কোন ধনী গরিব নেই, সাদা কালো নেই এমনকি নেই ভিআইপি আর আম জনতার পার্থক্য। পুরো হাসপাতালের এমন ব্যবস্থা যে বাংলাদেশের হালের বড়লোকি হাসপাতালগুলোতে এর ধারে কাছে আসতে পারবেনা। এমনকি আমাদের নেতা নেতৃরা দাঁত দেখাতে, নখ দেখাতে এবং মারা যেতে যে মাউন্ট এলিজাবেথ বা বামরুনগ্রাদে যায়, সেই বামরুনগ্রাদের বানিজ্যিক চেহারা ভেঙ্গে কোনদিনও ইটালির এই ছোট্ট মফস্বলের সরকারী হাসপাতালটার সমতুল্য হওয়াও সম্ভব নয়।


দুপুরের পর আবার যাত্রা শুরু। প্লান পুরোপুরি বাবলু ভাইয়ের। এতক্ষণ একটা সোনালী রোদ ছিল। আবার হঠাৎ করেই আকাশ মেঘলা। আসলে শুধু আকাশ মেঘলা বললে ভুল হবে। মাটিও মেঘলা। মেঘ এসে ছুঁয়েছে সব কিছু। বাড়ি, ঘর, রাস্তা, গাড়ি, বাগান সব কিছুতেই মেঘ। আমরা চলছি মেঘ ফুঁড়ে। মোট ৮ টি আলপাইন দেশ মিলিয়ে প্রায় ১২০০ কিলোমিটার বিস্তৃত আল্পস পর্বত মালার বেশ কিছু চূঁড়া আছে যারা কিনা ৪০০০ মিটারের চেয়েও উঁচু। বনেদি এসব চূড়াকে বলা হয় ফোর থাউজেন্ডার। আমরা চলেছি এরকমই একটা চূড়ার মাথায়। সেখানে আছে আরেক শহর। স্থানীয়ভাবে একে বলা হয় দোতলা শহর।


গাড়ি করে পাহাড়ে ওঠা, এ আর এমন কি? কিন্তু পুরো রাস্তাই যে মেঘের ভেতর। ৫০ মিটার দূরত্বেও কিছু চোখে দেখা যায় না। মাঝে মাঝে এমন হয় হঠাৎ করে পুরোটাই হোয়াইট আউট। গা ছম ছম। প্রায় ১২০০০ ফুট ওঠার পর দিব্যি একটা ছোট শহর। যেন ঝুম বর্ষার দুপুরে খেয়ে দেয়ে আয়েশ করে পুরোটা শহর ভাত ঘুমে। নিরিবিলি। লোক নেই জন নেই। কিছু কিছু বাড়ি, হোটেল, কফিশপ।


আমরা একটা কফিশপে বসি। এটাও আসলে একটা স্টেশন। তবে বাস বা ট্রেন কোনটাই নয়। অদ্ভুদ কিসিমের এক গাড়ি ছাড়ে এখান থেকে। ঠিক রোপ ওয়েও নয়। আসলে বিশাল বড় রোপওয়ের কোচের মতো দেখতে একটা কোচ। পাহাড়ের গায়ে পাতা রেললাইন দিয়ে নামে, একদম খাঁড়া পথে। প্রতি ১৫ মিনিট পর পর ছাড়ে আবার নিচ থেকে যাত্রী নিয়ে একই পথে উঠে। লোক জন থাক আর নাই থাক, এ গাড়ির যে ড্রাইভার সে যায় আর আসে একেবারে সময় ধরে।


আপাতত কফি শপ ছাড়া কিছুই আর চোখে পড়েনা। শুধু মেঘের আঁচল ছাড়া। এর মধ্যেই ভোজবাজির খেল। মুহুর্তে কি যেন হলো। মেঘ উধাও। কিভাবে কোথায় যেন গেল মিলিয়ে। একটা আলোর রশ্মি। চনমনে আমেজ। পুরো বোলজানো শহর, পাহাড়ে ওঠার রাস্তা সব চোখের সামনে পরিস্কার, তবে অনেক অনেক নিচে। যে রাস্তা দিয়ে আমরা শহর ছেড়েছি সে রাস্তায় নড়ছে কিছু ম্যাচবাক্স। গাড়ি গুলো হয়ে গেল ম্যাচের বাক্স আর বাড়ি গুলো জুয়েলারি বক্স। মেঘ যেহেতু সরেছে, তাহলে তিনতলাতে যাওয়া নয় কেন? তো আবার গাড়ি যাত্রা। এবার তিনতলা শহর। পাইনের বন দিয়ে বেশ চিকন রাস্তা। খুব যে বেশি মানুষ এখানে আসেনা পথের চেহারাই তা বলে। শীতে এখানে বরফ পড়ে প্রায় ৮-১০ ফুট। রাস্তার পাশে তাই অজ¯্র সংকেত আর সাবধান বাণী। রোমহর্ষক পথ মাড়িয়ে যখন আমরা তিন তলায় যাই। তখন চারিদিকে শুধু বরফ মোড়ানো আল্পসের বনেদি চূড়ারা। শীতে কেঁপে বৃষ্টিতে ভিজে পাহাড় দেখা হলো অনেক। এবার নামার পালা। সেই একই মোড়ানো ঘোড়ানো পথ বেয়ে তুলনামূলক সমতল। এরপর সেই আঙ্গুরলতা। আঁকা বাঁকা কালো পথ সবুজ প্রান্তর।


ঘড়িতে তখন প্রায় ৮ টা। দিনের আলোয় ভূবন ভরা। গাড়ি এসে থামলো একটা লেকের ধারে। ইতালীয়ানে যার নাম লাগো ডি রেসিয়া আর জার্মানে রেসেনজি। আল্পসের এক কিলোমিটার উচ্চতায় সবচেয়ে বড় লেক এই রেসেনজি। বোলজানোর এ লেক থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরে অস্ট্রিয়া আর ৩ কিলোমিটার দূরে সুইজারল্যান্ড। সে যে যেখানেই থাকনা কেন, এই লেকে এসে আমরা মুগ্ধ। সন্ধ্যার ঠিক মুখে মুখে লেক এবং এর আশপাশ জুড়ে অপূর্ব এক আলোর নাচন। নরম, কোমল, ধুসর নীলচে রঙ।


আমি পৃথিবীতে কোথাও কোন দিন এরকম অদ্ভুত সুরমা নীল আলো দেখিনি। কেন যেন ক্ষণিকের জন্য হলেও মন কেমন করে। মনে হয় কোন এক অপার্থিব জগতের একটি জানালার কপাট খুলেছে কেউ আনমনে। তারই ফাঁক গলে বিচ্ছুরিত হয়ে কিছু আলো এসে পড়েছে বোলজানোর এ লেকটির বুকে। অসাধারণ!
ভ্রমণকাল: মে ২০১৩

Leave a Comment