Skip to content Skip to sidebar Skip to footer

স্মৃতির পাতায় নেদারল্যান্ডস!

লিখেছেন: মোঃ রাসেল আহম্মেদ (লিসবন, পর্তুগাল থেকে)

নেদারল্যান্ডসে আসছি প্রায় চার মাসের বেশী হয়ে গেল কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও পড়াশোনার পাশাপাশি কোন কাজের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হইনি। ইতিমধ্যে দেশটির রাজধানী শহর আমস্টারডাম সহ প্রায় ৬/৭ টি বড় বড় শহর চষে বেড়িয়েছি কিন্তু কোথাও কোন কাজের সন্ধান মেলেনি। অনেক ব্যায়বহুল দেশ হওয়াতে যা সঞ্চয় ছিল তা শেষের পথে। তাই হন্যে হয়ে কাজ খুজছিলাম বিভিন্ন শহরে এবং পরিচিত মানুষজনের নিকটে। 
উপায় অন্তর না পেয়ে ইউরোপের অন্য দেশে যারা শুভাকাঙ্ক্ষী ও পরিচিত লোকজন ছিল সবাইকে নক দেওয়া শুরু করলাম। একেকজন একেক ধরনের পরামর্শ দিতে লাগলো। বেলজিয়াম থেকে এক ছোট ভাই পরিচয় করিয়ে দিল অন্য এক লোকের সাথে যে-কিনা পর্তুগাল থাকে। আমার সাথে পর্তুগালের সেই ভদ্রলোকের কথা হলো এবং জানাল তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবার নেদারল্যান্ডস থাকে। তার সাথে কথা বলে আমাকে জানাবে কিছু একটা শীগ্রই। 
৩/৪ মাস পরে অনন্ত কাজ পাওয়ার একটি আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। সেই সময়ে আন্তর্জাতিক ছাত্র ছাত্রীদের সপ্তাহে কেবল মাত্র ১০ ঘন্টা কাজের অনুমতি ছিল, যা বর্তমানে ২০ ঘন্টা। তাই কাজ পেতে বেশ খানিকটা বেগ পেতে হয়েছিল। ছোট ভাইয়ের বন্ধু আরো জানাল তার বন্ধু পরিবার নিয়ে নেদারল্যান্ডস থাকেন এবং বন্ধুর সালা-বাবুর ভাল ব্যবসা বানিজ্য রয়েছে এখানে। শুনে খুশী হলাম এবং আশান্বিত হলাম। কারন যে কোন জায়গায় নতুনদের কাজ পাওয়ায় জন্য এমন প্রতিষ্ঠিত প্রবীন মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাছাড়া আমার মত যারা গুড ফর নাথিং মানে কোন বিশেষ হাতের কাজ জানে না তাদের জন্য এধরনের লিংক আরো জরুরি। ইউরোপের প্রথম কয়েকমাসে বুঝতে সক্ষম হয়েছি এখানে কাজের মধ্যে কোন শ্রেনী বিভাজন নেই। কিন্তু কোন না কোন কাজ জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তা না-হলে কাজ ব্যবস্থা করা খুবই দুষ্কর হয়ে যায়। তাছাড়া স্থানীয় ভাষা জানাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে। 
অন্য সমস্যা ও আছে এখানে। কাজ পেতে বয়স একটি বড় বিষয় এখানে, কারন বয়স অনুযায়ী ঘন্টা প্রতি বেতন নিধারিত হয়। ১৮ বছর থেকে ২৯ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন বয়স ভেদে বেতন নির্ধারন হয়ে থাকে। এই সময়ের মধ্যে যত কম বয়স বেতন ও তত কম হয়ে থাকে। আর ২৯ এর উপরে সবার সমান বেতন কাঠাম হয়ে থাকে। অভিজ্ঞতা, ভাষা ও বয়সের কারনেও আমার কাজ পেতে আরো একটু বেগ পেতে হচ্ছে।
যাইহোক আগেই ধারনা করেছিলাম প্রবাস জীবন অতটা সহজ হবে না। তাই কখনো হতাশ হইনি। চেষ্টা চালিয়ে গেছি কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকার ফলে হয়ে উঠেনি হয়তো। কারন অনেক দূরের শহর থেকে কাজের অফার পেয়েছি কিন্তু দূরত্ব বেশী হওয়াতে সেখানে যোগ দিতে পারিনি। তাছাড়া বেশ কিছু কাজ পেয়েছি কোন ধরনের চুক্তি ছাড়া কিন্তু ঘন্টা প্রতি কম মজুরির কারনে তাও ফিরিয়ে দিয়েছি।
কিছুদিন পরে নেদারল্যান্ডস এর ভদ্রলোক আমাকে কল দিল এবং আমার সিটি থেকে প্রায় একশ মাইল দূরের খনিংগেন শহরে যেতে বল্লেন। আমার কাজের ব্যাপারে কথা হয়েছে সেই শহরের কয়েকজনের সাথে এমনটি জানালেন। দেরী না করে পরের দিনই যেতে চাইলে তিনি সম্মতি দিলেন। নেদারল্যান্ডস এ ট্রেন যোগাযোগ খুবই জনপ্রিয় এবং দ্রুত। একশ কিলোমিটার ঘন্টা খানিকের মধ্যে ভ্রমন করা যায়।
স্বাভাবিক ভাবে তিনি আমাকে ট্রেন স্টেশন থেকে নিতে আসলেন। সরাসরি কথা হয়ে আরো ভাল লাগলো। সহজ সরল স্বভাবের মানুষ এবং খুবই অকপট। দশ মিনিটের কথোপকথনে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় আমার সাথে শেয়ার করেছে। আমি এটিকে ভাল একটি দিক হিসেবে নিলাম কারন আমাকে তিনি ইতিমধ্যে আপন ভাবতে শুরু করেছিলেন। যদিও আমি কিছুটা লজ্জা পাচ্ছিলাম তার ব্যক্তিগত বিষয় গুলো শুনে, কিন্তু সেটি ওনাকে বুঝতে দিলাম না।
বয়সে আমার বাবার বয়সী হলেও মনের দিক থেকে আমার চেয়েও কম বয়সী। সে আমাকে নেদারল্যান্ডস এর বিভিন্ন সুবিধা ও অসুবিধা জানাতে লাগলেন। পথি মধ্যে রেড লাইট জোন পাড় হচ্ছিলাম। আমাকে প্রশ্ন করলো আপনি কি জানেন এটি কি? আমি তার এই প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না, তাই বলে দিলাম জানিনা। যদিও রেড লাইট সম্পর্কে আমি আগে থেকেই জানি। কেননা নেদারল্যান্ডস এর প্রায় সবকটি বড় শহরে এমনটি দেখা যায় এবং তা দেখার জন্য প্রতি বছর লক্ষ কোটি মানুষের সমাগম ঘটে এই দেশে!
তিনি তখন আমাকে বল্লেন, শুধুমাত্র এই রেড লাইট ও বার ডিসকো থাকার কারনে তিনি দেশটিতে পড়ে আছেন। যাইহোক আমার তার ব্যক্তিগত বিষয়ের প্রতি অটটা মনোযোগ ছিল না। আমি হঠাৎ বলে উঠলাম কারো সাথে কি আমার কাজের ব্যাপারে কথা হয়েছে? তিনি জানালেন দুজনের সাথে কথা হয়েছে। আমি বল্লাম চলেন ওনাদের সাথে আগে দেখা করি। তাই তিনি পর্যায়ক্রমে দুজনের সাথে দেখা করিয়ে দিলেন।
দুজনেই যথেষ্ট আন্তরিকতার সাথে কথা বলেছেন এবং আস্বস্ত করেছেন কাজের কোন সুযোগ তৈরি হলে আমাকে অবশ্যই জানাবেন। তখন হুমায়ুন ভাই তার বাসায় আমাকে নিলেন এবং দুপুরের খাবার খাওয়ালেন। এক ছেলে এক মেয়ে সহ চার জনের সুন্দর পরিবার এবং চারজনই কাজ করছে। সবাই বাসায় ছিল এবং বেশ আন্তরিক মনে হল। পরক্ষনেই হুমায়ুন ভাই আমাকে নিয়ে চল্লো কাছাকাছি একটি মার্কেটে এবং সেখান থেকে একটি জামা উপহার হিসেবে কিনে দিয়েছিলেন এক দিনের পরিচয়ে!
বিকেলে নেদারল্যান্ডসের সর্ব উত্তরের সেই ক্ষনিঙ্গেন শহরটি ঘুরেফিরে আমি এবার ডরমিটরিতে ফিরে যেতে চাইলাম। সেই ভাই আমাকে স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন এবং খানিকটা ভরসা দিলেন যেন কাজের জন্য চিন্তা না করি। সপ্তাহ খানিকের মধ্যে ফোন আসলো সেই ভাইয়ের কাছ থেকে এবং জানালেন ক্ষনিঙ্গেন পার্শবর্তী শহর আসানে একটি রেস্টুরেন্টে কাজের ব্যবস্থা হয়েছে যা আমার শহর থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে। যতদূরেই হোক কাজের ব্যবস্থা হয়েছে তাই অনেক!
আমি প্রথমে প্রস্তাব দিলাম যেই তিনদিন আমার ক্লাস থাকেনা বিশেষ করে শুক্রবার, শনিবার ও রবিবার কাজ করার আবেদন করলাম। সাহিন ভাই যিনি রেস্টুরেন্টের মালিক তিনি জানালেন অনন্ত একমাস যেন ফুলটাইম ডিউটি করি তারপরে সপ্তাহে যা-কদিন মন চায় তা করতাম। রাজি না হয়ে কোন উপায় ছিলনা কারন গত চারমাস বিভিন্ন শহরে অনেক চেষ্টা করেও কোন কাজের সন্ধান মেলেনি। তিনি জানালেন আমার জন্য থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে তাই আর না করলাম না। কারন নেদারল্যান্ডসে থাকার ব্যবস্থা করা বেশ জটিল এবং বিভিন্ন নিয়মকানুন অনুসরণ করতে হবে যা সময় সাপেক্ষ এবং ব্যায়বহুল।
ঠিকানা অনুযায়ী চলে গেলাম সেই শহর এবং রেস্টুরেন্টে। স্টেশনে রেস্টুরেন্টের মালিকের ছোট ভাই আসছিল তাই তেমন কোন বেগ পেতে হয়নি। পরের দিন দুপুরের পর থেকেই কাজ শুরু করলাম। কোহিনুর অব ইন্ডিয়া যা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট হিসেবে পরিচিত কিন্তু পরিবেশন করা হয় মূলত বাংলা খাবার। এখানে সাধারণ বিকাল ৪ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত ভাল চাপ থাকে কাস্টমারের। মূল শেপের হেলপার হিসেবে আমার কাজ এবং আমার মত আরো একজন ছিল একই কাজের। আমাদের দুজনের কাজ হচ্ছে মূলত প্রধান শেপকে সাহায্য করা।
কয়েকদিনের মধ্যে সবাই আমাকে বেশ পছন্দ করতে শুরু করলো। বিশেষ করে শেপ এবং সেই প্রতিদিনই আমাকে কোন না কোন রেসিপি শিখিয়ে দিচ্ছেন যা আমার সহকর্মীর মোটেই পছন্দ নয়। বাংলাদেশী সেই ছেলেটা নেদারল্যান্ডসে অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক হিসেবে আশ্রয়ে বা শরনার্থী হিসেবে আছেন। সরকার থেকে বিশেষ সুবিধা পেলেও অবৈধ এবং লুকিয়ে কাজ করছে এখানে। সব সময় আমার উপর এক ধরনের আদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চায় যা আমি মোটেই সুযোগ দিইনি প্রথম থেকে। ফলে দিনে দিনে সেই আমাকে তার শত্রু ভাবতে শুরু করলো।
বিশেষ করে সেই দীর্ঘ ৬ মাসের বেশী সময় ধরে কাজ করলেও শেপের মনোযোগ আকর্ষন করতে পারেনি। পক্ষান্তরে সপ্তাহ খানেকের মধ্যে শেপ আমাকে আপন করে নিয়েছে এবং বিভিন্ন কাজ ও রেসিপি সম্পর্কে ধারনা দিয়েছেন। তাই ব্যাপারটি সেই ছেলেটি ভাল ভাবে নেয়নি। সপ্তাহ খানেক পরে থেকে সে আমার সাথে নানান বিষয়ে বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ে। মোটকথা আমাকে সেই মোটেই টলারেট করতে পারছেনা। কাজের ১৭ দিনের মাথায় আমাকে কাজ থেকে নিষেধ করা হয় এবং জানিয়ে দিল আর কাজে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
আমি জানার চেষ্টা করলাম কেন আমার সাথে এমনটি করা হল? একে একে আমার সমস্ত অপরাধ বলতে লাগলেন মালিকের ছোট ভাই। প্রথম অপরাধ আমি অন্য একটি ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে কাজের জন্য গিয়েছে আরো ভাল বেতনের আশায়! কিন্তু মজার বিষয় ছিল আমি তখনই জানতে পারলাম যে এই শহরে আরো একটি ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট আছে। দ্বিতীয় অপরাধ ছিল আমি মালিকের ডাচ স্ত্রী কে নিয়ে নাকি খারাপ মন্তব্য করেছি। মূলত আমার মালিকের স্ত্রী কে তা আমি জানিই না!
তাছাড়া আমার বিষয়ে নাকি কাস্টমাস রিপোর্ট করেছে কিন্তু অভাক করা বিষয় ছিল আমি কখনো কাস্টমার সার্ভিস করিনি। এরকম আরো কিছু অবান্তর অভিযোগ ছিল আমার নামে যা শুনে আমার চোখ কপালে উঠার অবস্থা। ওনার কথা শুনে আমার আর বুঝতে বাকি রইলোনা যে আমার সাথের ছেলেটা এসব রটিয়েছে। আমি সেই দিনই ফিরে আসলাম বিশ্ব বিদ্যালয়ের ডরমিটরিতে। আসার ২/৩ দিন পরে আমাকে আবার কাজে ফিরে যেতে অনুরোধ করলো এবং সেই ছেলেটিকে তিরস্কার করছে। কিন্তু আমার আর মনমানসিকতা ছিল না ওদের মাঝে ফিরে যাওয়ার!
লেখক: ইসি মেম্বার, বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটস এসোসিয়েশন।

Leave a Comment